বিবেকানন্দ জন্মস্থান ও পৈতৃক আবাস: সিমলা পল্লীর ইতিহাসে এক আধ্যাত্মিক পরিক্রমা
উত্তর কলকাতার সরু গলিগুলোর মাঝে কত যে ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু সিমলা পল্লীর সেই বিশেষ বাড়িটির সামনে দাঁড়ালে আজও শরীরের রোম খাড়া হয়ে যায়। ১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি, এই ভিটেতেই জন্মেছিলেন আধুনিক যুগের এক মহান দার্শনিক এবং বিশ্বজয়ী সন্ন্যাসী — স্বামী বিবেকানন্দ। সম্প্রতি আমার সৌভাগ্য হয়েছিল স্বামীজীর সেই পৈতৃক আবাস এবং বর্তমানের 'ভিভেকানন্দ মিউজিয়াম' সশরীরে ঘুরে দেখার। সেই অভিজ্ঞতার ঝুলি এবং ইতিহাসের পাতায় লুকিয়ে থাকা কিছু অমূল্য তথ্য নিয়েই আজকের এই ব্লগ।
৩০০ বছরের ইতিহাস ও স্থাপত্যের আভিজাত্য
আজ যেখানে ১০৫ বিবেকানন্দ রোড, সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকলে দেখা মেলে সেই বিশাল দত্ত পরিবারের স্মৃতিবিজড়িত দালানের। স্বামীজীর মহাজ্যেষ্ঠ ঠাকুর রামমোহন দত্ত প্রায় তিন শতাব্দী আগে এই সুবিশাল বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন। একসময় এই বাড়ির চারপাশে ছিল অবারিত বাগান আর খোলা জায়গা। যদিও সময়ের বিবর্তনে এবং শহরায়নের চাপে সেই বাগান আজ হারিয়ে গেছে, আর চওড়া রাস্তাগুলো পরিণত হয়েছে গলিতে।
বাড়ির মূল কাঠামোটি বেশ আকর্ষণীয়। সদর দরজা দিয়ে ঢুকলে একপাশে ছিল দরোয়ানের ঘর। ভেতরে প্রশস্ত প্রাঙ্গণ এবং এক কোণে ঘোড়া রাখার আস্তাবল। দালানটি মূলত দুই অংশে বিভক্ত ছিল—ডানদিকে ছিল পুরুষদের বসার ঘর আর সামনে ও বামের দুইতলা অংশে ছিল অন্দরমহল। অন্দরমহলের ল্যাটিস বা কাঠের বেড়ার কাজ এখনও আপনাকে সেই পুরনো দিনের বনেদিয়ানার কথা মনে করিয়ে দেবে, যেখান থেকে মহিলারা একসময় ধর্মীয় উৎসব ও প্রার্থনা দেখতেন।
এক বিষাদময় লড়াই এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনরুত্থান
নরেন্দ্রনাথ দত্তের (স্বামী বিবেকানন্দ) পিতার অকাল মৃত্যুর পর এই সুখী পরিবারটি বড় ধরণের সংকটের মুখে পড়ে। শোকের ছায়া কাটতে না কাটতেই শুরু হয় সম্পত্তির ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে আত্মীয়দের মামলা। উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ানো এই বিবাদ শেষে সম্পত্তি দশ ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এমনকি বাড়ির একটি বড় অংশ ভেঙে তৈরি করা হয় সাধারণ চলাচলের পথ।
সময়ের নিষ্ঠুর পরিহাসে একসময়ের রাজপ্রাসাদ সমতূল্য এই বাড়িটি একসময় বস্তিতে পরিণত হয়েছিল। প্রায় ১৪৩টি পরিবার এবং ছোট ছোট দোকান এই ভগ্নপ্রায় দালানে বসবাস শুরু করেছিল। স্বামীজীর স্মৃতিবিজড়িত এই ভিটে যখন প্রায় ধ্বংসের মুখে, ঠিক তখনই এগিয়ে আসে রামকৃষ্ণ মিশন।
ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধার: আধুনিক কারিগরি ও ভক্তির মেলবন্ধন
বাড়িটি পুনরুদ্ধারের কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। রামকৃষ্ণ মিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা এবং বিশেষজ্ঞ পরামর্শকদের সহায়তায় মূল নকশা অক্ষুণ্ণ রেখে পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করে। মজার ব্যাপার হলো, ১৮শ শতাব্দীর সেই আদি আমেজ ফিরিয়ে আনতে আধুনিক সিমেন্টের বদলে পুরোনো আমলের প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল।
অবশেষে ২৬ সেপ্টেম্বর ২০০৪ তারিখে রামকৃষ্ণ মিশনের তৎকালীন সভাপতি স্বামী রঙ্গনাথানন্দজি মহারাজ বাড়িটি উৎসর্গ (Consecrate) করেন। বর্তমানে কলকাতা পৌরসভা এটিকে 'Grade-I Heritage Building' হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে।
মিউজিয়াম ভ্রমণ: শৈশব থেকে কৈশোরের যাত্রা
বর্তমানে এই হেরিটেজ ভবনটি একটি অত্যাধুনিক মিউজিয়ামে রূপান্তরিত হয়েছে। এখানে পা রাখলে আপনি স্বামীজীর শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলোতে ফিরে যাবেন। তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র এবং বিভিন্ন শিল্পকর্মের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তাঁর বেড়ে ওঠার দিনগুলি। এই মিউজিয়ামটি কেবল একটি দর্শনীয় স্থান নয়, বরং শিক্ষার্থীদের জন্য 'মূল্যবোধ শিক্ষা' (Value Education) ছড়িয়ে দেওয়ার একটি অনন্য কেন্দ্র। স্বামীজীর আদর্শ ও বাণীকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এটি অসাধারণ ভূমিকা রাখছে।
🕰️ আপনার ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য
আপনি যদি স্বামীজীর এই পবিত্র জন্মস্থানে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, তবে নিচের সময়সূচীটি অবশ্যই মাথায় রাখবেন:
উপসংহার: স্বামী বিবেকানন্দের পৈতৃক বাড়ি পরিদর্শন করা মানে কেবল একটি পুরনো দালান দেখা নয়, বরং ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণকে অনুভব করা যা ভারতকে বিশ্বের দরবারে নতুন করে চিনিয়েছিল। আপনি যদি ইতিহাসের অনুরাগী হন কিংবা স্বামীজীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হতে চান, তবে কলকাতার এই আধ্যাত্মিক কেন্দ্রটিতে একবার ঘুরে আসা আপনার জন্য বাধ্যতামূলক।
আপনি কি কখনও এই ঐতিহাসিক স্থানটি পরিদর্শন করেছেন? আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।
No comments:
Post a Comment